অরণ্য, অলৌকিকতা ও অমর বিশ্বাসের কাহিনি: শ্রীশ্রী চিত্তেশ্বরী মন্দির

 পর্ব ৩ 

বরানগরের উদ্যানবাটী অঞ্চল থেকে অতি দূরে নয়, কাশিপুর ও চিৎপুরের সংযোগস্থলে খগেন চ্যাটার্জী রোডের এক নিভৃত কোণে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হল শ্রীশ্রী চিত্তেশ্বরী মন্দির। চারপাশের আধুনিক কোলাহলের মাঝেও এই মন্দির যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধ্যাত্মিক দ্বীপ, যেখানে বিশ্বাস, লোককথা ও সাধনার অদৃশ্য সুতোয় আজও গাঁথা রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর স্মৃতি।

চিত্তেশ্বরী নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্য ও কৌতূহল। লোকমুখে শোনা যায় নানা ব্যাখ্যা। কেউ বলেন, চিতে নামের এক দুর্ধর্ষ ডাকাতের নামেই দেবীর এই নামকরণ। আবার কারও মতে, চিৎপুর অঞ্চলের নাম থেকেই দেবীর নামের উৎপত্তি। সত্যের নির্দিষ্ট পথ হয়তো ইতিহাসের ধূলায় ঢাকা পড়েছে, কিন্তু জনশ্রুতি ও বিশ্বাস মিলেমিশে দেবীর নামকে আজও জীবন্ত রেখেছে।



যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখনকার চিৎপুর আজকের মতো জনবহুল ছিল না। বিস্তীর্ণ অরণ্য, গহিন জঙ্গল আর অজানা আতঙ্কে মোড়া ছিল এই অঞ্চল। হিংস্র জন্তু আর ডাকাতের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল দুর্বিষহ। এই অরণ্যের মধ্যেই বাস করত এক ভয়ংকর চিতে ডাকাত। তার নিষ্ঠুরতার গল্প যেমন ভয়ের জন্ম দিত, তেমনি তার মাতৃভক্তির কাহিনি ছিল বিস্ময়কর। লুণ্ঠনের আগে সে কখনোই মায়ের আশীর্বাদ না নিয়ে বেরোত না। তার সেই অগাধ ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং মহামায়া দুর্গা তাকে স্বপ্নাদেশ দেন। এই আদেশে বলা হয় গঙ্গার জলে ভেসে আসা এক কাঠখণ্ড থেকে যেন তিনি তাঁর মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করেন।

স্বপ্নাদেশের পর ভোরের আলো ফোটার আগেই চিতে ছুটে যায় গঙ্গার ঘাটে। অলৌকিকভাবে সে দেখতে পায় এক বিশাল কাঠের টুকরো জলের স্রোতে ভেসে আসছে। সেই কাঠ থেকেই সে নির্মাণ করে দশভুজা দেবীর মূর্তি এবং অরণ্যের গভীরে এক পর্ণকুটিরে প্রতিষ্ঠা করে দেবীকে। সেই দিন থেকেই দেবী দুর্গা এই স্থানে চিত্তেশ্বরী নামে পূজিতা হয়ে আসছেন। ভয়ংকর অরণ্যের মাঝেও যিনি ছিলেন আশ্রয় ও শক্তির প্রতীক।

চিত্তেশ্বরী দেবীর মূর্তি শারদীয় বা বাসন্তী দুর্গার প্রচলিত রূপ থেকে ভিন্ন। এখানে নেই লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের সঙ্গ। দেবীর বাহন সিংহের মুখও কিছুটা ঘোড়ার আদলে গড়া। দেবীর পাশে স্থাপিত রয়েছে একটি বাঘের মূর্তি, যা দক্ষিণরায়ের কাহিনির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তখনকার চব্বিশ পরগনা অঞ্চলে বাঘরূপী দক্ষিণরায়ের আতঙ্কে জনজীবন বিপর্যস্ত ছিল। তাঁকে তুষ্ট করতেই চিত্তেশ্বরীর সঙ্গে দক্ষিণরায়ের আরাধনাও ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে প্রচলিত হয়।



চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পর বহুদিন দেবীমূর্তি অরক্ষিত অবস্থায় জঙ্গলে পড়ে থাকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অরণ্যের ভয়াল রূপ বদলাতে থাকে। গঙ্গার ঘাটে মাঝিদের আনাগোনা বাড়ে, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানববসতি। ঠিক সেই সময়েই আবির্ভাব ঘটে নৃসিংহ ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক সাধকের। সাধনার উদ্দেশ্যে তিনি এই অরণ্যে আশ্রম স্থাপন করেন। দেবী তাঁকেও স্বপ্নাদেশ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও অবহেলার কথা জানান।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সাধক এক পরিত্যক্ত পর্ণকুটিরে আবিষ্কার করেন দেবীর বিগ্রহ। সেই স্থানেই দেবীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তন্ত্রমতে পূজা শুরু করেন তিনি। শিষ্যদের নিয়ে গড়ে ওঠে এক কঠোর সাধনাশ্রম, যেখানে গৃহী ভক্তদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সন্ন্যাস ও তন্ত্রসাধনাই ছিল সেই আশ্রমের প্রধান পথ।

সময় তখন ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দ। চিত্তেশ্বরী দেবীর মাহাত্ম্যের কথা শুনে তৎকালীন জমিদার মনোহর ঘোষ আশ্রমে এসে দর্শন করেন। সাধকের ত্যাগ ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তিনি দেবীর জন্য একটি স্থায়ী মন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরই উদ্যোগে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীশ্রী চিত্তেশ্বরী মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হয় ও এক গহিন অরণ্যের দেবী তখন প্রতিষ্ঠা পেলেন স্থায়ী ইট-পাথরের আবাসে।

পরবর্তীকালে আশ্রমের নিয়মেও আসে পরিবর্তন। সন্ন্যাসীদের বিবাহ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও নৃসিংহ ব্রহ্মচারীর অষ্টম শিষ্য শ্যামসুন্দর ব্রহ্মচারী সেই বিধি ভঙ্গ করেন। তাঁর দুই কন্যা যদুমণি ও ক্ষেত্রমণি। ক্ষেত্রমণির বিবাহ হয় হালিশহরের সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে। কালক্রমে এই পরিবারই চিত্তেশ্বরী মন্দিরের সেবায়েত ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছে।

আজ চিত্তেশ্বরী মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এ এক জীবন্ত ইতিহাস। অরণ্যের ভয়, ডাকাতের ভক্তি, তান্ত্রিক সাধনা ও জমিদারি পৃষ্ঠপোষকতার মিলনে গড়ে ওঠা এই তীর্থস্থান আজও বরানগরের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। শতাব্দী পেরিয়েও দেবীর দীপ্তি ম্লান হয়নি বরং ভক্তির প্রদীপে আজও জ্বলছে চিত্তেশ্বরীর অপরাজেয় মহিমা।


ক্রমশ..... 


🖋️ স্বকীয় 

📸 ইন্টারনেট

Comments

Popular posts from this blog

নামের ইতিহাস : বরানগর

রঘুনাথ আচার্য্যের পাঠবাড়ি : বরানগর