রঘুনাথ আচার্য্যের পাঠবাড়ি : বরানগর

বরানগর—গঙ্গাতীরের সেই প্রাচীন জনপদ। এটি শাক্ত উপাসনা ও বৈষ্ণব ভক্তিধারার এক অনবদ্য মিলনবিন্দু। নদীর ধারে নির্জন এই গ্রামটির বুকে রঘুনাথ আচার্য্যের আগমন যেন এক নূতনের সূচনা। তাঁর কুটিরে প্রতিদিনের শাস্ত্রপাঠ ও পূজার ধোঁয়ায় ভরে উঠত আকাশ, আর আগরপাড়া-পানিহাটির জলপথে ছড়িয়ে পড়ত তাঁর খ্যাতির গল্প। সেইসব নিস্তব্ধ দিনে তাঁর হঠাৎই জেগে ওঠে এক অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা। নবদ্বীপধামের অদ্বিতীয় মহাপুরুষ নিমাই পণ্ডিতের দর্শনলাভ করতেই হবে তাঁকে। রঘুনাথের সেই দীর্ঘ এবং বিপদসঙ্কুল যাত্রা শেষ করে নবদ্বীপের শ্রীবাস অঙ্গনে পৌঁছান এবং তিনি দেখেন নৃত্য-মগ্ন ভক্তসমাজ ও তাদের মধ্যে দীপ্তিময় অবয়বে উদ্ভাসিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্বরূপ। মহাপ্রভুর কোমল বুকে আশ্রয় পেয়ে রঘুনাথ পেয়ে যান জীবনের পথনির্দেশ।মহাপ্রভুর নির্দেশমতো দীক্ষার জন্য তিনি গদাধর পণ্ডিতের শরণাপন্ন হন ও বরানগরে ফিরে আসেন এক মহাগ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্যে।

ছবি : ইন্টারনেট 

রঘুনাথ আচার্য্য মহাপ্রভুর নির্দেশ মেনে বরানগরে ফিরে শুরু করেন ভাগবৎ রচনা। সেই নির্মল সাধনক্ষেত্রে পরবর্তীতে স্বয়ং মহাপ্রভু এসে বসে শ্রবণ করেছিলেন সেই ভাগবৎ যার প্রথম দুটি শ্লোক তাঁর রচিত । এ ঘটনা বরানগরের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় মুহূর্ত। গঙ্গার ধারে মহাপ্রভুর রেখে যাওয়া কাঁথা আজও স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঁথাধারী মঠে, যেন ভক্তসমাজের জন্য এক শাশ্বত আশ্বাসের মতো। নিত্যানন্দ ও গৌরাঙ্গের বিগ্রহ, কাঠের খড়ম, ভক্তদের অশ্রুসিঞ্চিত প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এই রঘুনাথ পণ্ডিতের কুটির (পাঠবাড়ি) আধ্যাত্মিকতার গভীরতম স্পর্শে প্রাণিত। বরানগরের ভূমি যেন সেই দিন থেকেই হয়ে ওঠে এক আলৌকিক সাধনকেন্দ্র, যেখানে গঙ্গার ঢেউ আজও বহন করে প্রভুর পদধূলির অতল স্মৃতি।

বরানগরের পাঠবাড়ি শুধু একটি আশ্রম নয়; এ যেন বৈষ্ণব ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা, যেখানে যুগে যুগে সাধক-ভক্তদের সঞ্চিত অমূল্য সাধন-ধারা আজও নিঃশব্দে প্রবাহিত। প্রায় দু’শো বছর আগে পর্যন্ত এই স্থানটি ছিল জনশূন্য, উপেক্ষিত, ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসা এক স্মৃতিভূমি।  বৈষ্ণব সাধক রামদাস বাবাজি হাত ধরেই পাঠবাড়ির পুনর্জাগরণ শুরু হয়। তিনি বুঝেছিলেন, বরানগরের এই ভূমি কেবল মহাপ্রভুর পদধূলিতে পবিত্র নয়, রঘুনাথ আচার্য্যের ভাগবৎ রচনার স্মৃতি বহনকারী এক অপরিসীম ঐতিহাসিক সম্পদ। তাই মৃত্যুশয্যায়ও তিনি তাঁর শিষ্যদের উপদেশ দিয়ে যান—এখানে যেন চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন হরিনামজপ চলতে থাকে। সেই উপদেশ আজও পাঠবাড়ির প্রাণস্পন্দন, রাত-দিনে অসংখ্য কণ্ঠের নিভৃত ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হয়—

“জপ হরে কৃষ্ণ হরে রাম / ভজ নিতাই-গৌর রাধে শ্যাম।”


আজকের পাঠবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ বৈষ্ণব গ্রন্থাগার হিসেবে সুপরিচিত। এখানে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, জিবন গোস্বামীসহ বহু চৈতন্যভক্তের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি যার কিছু প্রায় অর্ধ-সহস্রাব্দ প্রাচীন। পাতার ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে সময়ের দগদগে চিহ্ন, অথচ শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অগাধ আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য।  আশ্রমের প্রাঙ্গণে প্রতিদিন চলে ভক্ত-সম্মিলন, গীতি-অভিসার, ভাগবৎ পাঠ এবং নানা উৎসব, যার ছন্দে সারা বছর গঙ্গাতীরের বাতাস পূর্ণ থাকে পবিত্র আবেগে।

মন্দির ও পাঠাগার উভয়েরই নির্দিষ্ট সময়ে দরজা খুলে যায়। সময় : সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা, আবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা-সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ঠিকানা:  ১৬, পাঠবাড়ি লেন। এটি মহারাজা নন্দকুমার রোডের সংলগ্ন সরু গলির অন্তরালে অবস্থিত হলেও এর অন্তর্গত আধ্যাত্মিক আবহ এক বিস্তৃত বিশ্বের মতো। পাঠবাড়ির এই দীর্ঘ ইতিহাস, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ শাস্ত্রসম্ভার ও অবিরাম হরিনামধ্বনি বরানগরকে আজও এক জীবন্ত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে। এখানে অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের ভক্তি ও ভবিষ্যতের সাধনপথ এক সুস্পষ্ট সুরে মিলেমিশে আছে।

Comments

Popular posts from this blog

নামের ইতিহাস : বরানগর

অরণ্য, অলৌকিকতা ও অমর বিশ্বাসের কাহিনি: শ্রীশ্রী চিত্তেশ্বরী মন্দির