নামের ইতিহাস : বরানগর

 পর্ব ১

বরানগর—নামটি উচ্চারণ করলেই কত শত স্মৃতি, কত অগণিত মানুষের পদচিহ্ন, অথচ যেন নিঃশব্দে সময়ের অতল গর্ভে ডুবে থাকা এক প্রাচীন মহল্লা। বৈবাহিক সূত্রে পাঁচ বছরের বাস, কিন্তু তার আগেই শৈশব থেকে এই শহরতলির অলিগলিতে আমার অসংখ্য যাতায়াত। বাবার মামার বাড়ি ও এক পিসির বাড়ি, আমার মাসির বাড়ি, মায়ের দুই মামা আর এক মাসির বাড়ি—সব মিলিয়ে বরানগর ছিল আমার বংশের এক অন্তরঙ্গ বিস্তার, আর আমার শৈশব-কৈশোরের জীবন্ত ভৌগোলিক মানচিত্র। কতবার এসেছি এখানে, তার হিসেব রাখা বৃথা; গঙ্গার হাওয়ার মতোই সে স্মৃতি উড়ে আসে, আবার মিলিয়ে যায়।

ছয়শো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজকের বরানগর দাঁড়িয়ে আছে—এককালে অচেনা এক গণ্ডগ্রাম, যার সঙ্গে 'নগর' শব্দ জোড়া লাগল ঠিক কীভাবে, তা যেন এক রহস্যময় গল্প। হুগলি নদীর পূর্ব তীরের এই জনপদ এই বরানগর। পূর্বে শিয়ালদহের ব্যস্ততা, পশ্চিমে স্নিগ্ধ গঙ্গা, উত্তরে দক্ষিণেশ্বরের ধূপ-ধুনোর গন্ধ, আর দক্ষিণে কাশীপুর-সিঁথির মোড়—সব মিলিয়ে এ স্থান যেন ইতিহাসের এক মায়ারুপে গড়া মানচিত্র।

লোককথা বলে, রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার দিগ্‌গজ জ্যোতিষী বরাহমিহির নাকি এই অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর নামেই নাকি বরাহনগর—পরে বরানগর। যদিও শূকর অর্থে 'বরাহ' থেকে নামকরণ—এই ব্যাখ্যাটা কেমন যেন অসংলগ্ন, অনাড়ম্বর বরং বহু গবেষকের মতেই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘বরহা’ শব্দের অর্থ দিয়েছেন ‘ময়ূরপুচ্ছ’—এবং তিন-চারশো বছর আগে এই অঞ্চলে নাকি ছিল ময়ূরের উচ্ছ্বল উপস্থিতি, আর ময়ূরপুচ্ছের হাট। চিড়িয়া মোড়ের নামকরণও যেন সেই স্মৃতিরই অঙ্গুলি নির্দেশ। ফলে অনুমান করা হয়, এই জনপদের আদি নাম বরহান নগর—যা সময়ের প্রবাহে বদলে হয়ে গেছে বরানগর।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্বেও বরানগর ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৬৫৮ সালে ডাচরা এখানে প্রথম কুঠি স্থাপন করে—তারই স্মৃতিবাহী কুঠিঘাট আজও গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে সময়ের সাক্ষ্য দেয়। কলকাতার উত্তর প্রান্তে আজ বরানগর হয়তো ক্ষুদ্র শহরতলি মাত্র; তবু বয়সের মহিমায়, উত্তরাধিকার-সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে, কলকাতা অনেক পরে জন্মানো এক নবীন নগরী বলেই মনে হয়।

রাজনীতি, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা—তিনই বরানগরের সঙ্গে গভীর অন্তঃসম্পর্কে লিপ্ত। সব শাখাকে একসঙ্গে স্পর্শ করা কঠিন; তাই এ পর্বে আমি ছুঁলাম মানুষের সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতির জায়গা—আধ্যাত্মিক বরানগরকে।

ছবি : ইন্টারনেট 


এই শহরের অলিতে-গলিতে যত মন্দির ছড়ানো, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। যেন ঈশ্বর স্বয়ং এখানে বহু রূপে, বহু নামে, বহু আঙিনায় অধিষ্ঠিত। তাই বরানগরকে ‘মন্দিরনগরী’ বললে অত্যুক্তি হয় না। শতাব্দীপ্রাচীন অধিকাংশ মন্দিরই আজ সময়ের ভারে জীর্ণ, তবু তাদের প্রতিটা ইঁট যেন যুগযুগান্তের আরতির ধ্বনি বয়ে আনে।

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবত-এ বরানগরের উল্লেখ পাওয়া যায়; এই ভূমিতে শাক্ত- বৈষ্ণব উভয় ধারার মিলন যেন অনায়াসে রচনা করেছে একটি পবিত্র আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল। ইতিহাস, ধর্ম, লোকবিশ্বাস, নদীর হাওয়া—সব মিলে বরানগর এক অলৌকিক স্তব্ধতা ও স্পন্দনের সম্মিলিত দেশ। এ যেন মাটির গন্ধে গড়া এক নগর—যেখানে অতীত কথা বলে, আর বর্তমান নীরবে শোনে।


ক্রমশ....


🖋️ স্বকীয় 



Comments

Popular posts from this blog

রঘুনাথ আচার্য্যের পাঠবাড়ি : বরানগর

অরণ্য, অলৌকিকতা ও অমর বিশ্বাসের কাহিনি: শ্রীশ্রী চিত্তেশ্বরী মন্দির